কলেজের দিনগুলো

Kayesh Chowdhury

Kayesh Chowdhury

Executive Vice President & Regional Head, Corporate Banking, BRAC Bank Limited

চট্টগ্রাম কলেজ- আমার গর্ব। এই কলেজ-কে আমি ধারণ করি স্মৃতিতে, আমার ভালোবাসায়, আমার উচ্ছলতায়। আমি গর্বিত, আমি এই কলেজের ছাত্র।

বনেদী সেন্ট মেরীস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষ করে মাধ্যমিকে আমি ভর্তি হই চট্টগ্রাম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এই স্কুলের উল্টোদিকে চট্টগ্রাম কলেজ আর মহসীন কলেজ পার্শ্ববর্তী। দু’টোই কো-এডুকেশন ফরমেটের। কিশোর মন তখন কখনো শান্ত দিঘির মতো শীতল আবার কখনো বাঁধ ভাঙ্গা উত্তাল ঢেউ। ক্রমেই অনুভুতির পরশগুলি ডানা মেলতে শুরু করলো। অন্যদিকে, এ অঞ্চলের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধূলায় চট্টগ্রাম কলেজ-ই শ্রেষ্ঠ। মুক্ত চিন্তার বিকাশ ও চর্চা এবং যে কোনো সামাজিক রাজনৈতিক সংকটে সংগ্রামে চট্টগ্রাম কলেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। আমার বাবা এই কলেজের ছাত্র ছিলেন। আমার নানা, চাচা, মামা, খালা, ফুফু- এরাও চট্টগ্রাম কলেজে পড়েছেন। চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তির বৈতরণী যেদিন পাড়ি দিলাম, মনে হচ্ছিলো যেনো বিশ্বজয় করে ফেলেছি। অন্যরকম একটা উচ্ছাস ছিলো। নতুন দিগন্তের হাসি যেনো স্বপ্নের সিঁড়ি খুঁজে পেলো।

বর্ণমালায় গাঁথা সুখ স্মৃতির সাথে মানুষের কিছু স্মৃতি থাকে অমলিন। কলেজ জীবনের স্মৃতি কখনোই ভুলে যাবার নয়। আমার এইচ.এস.সি. ব্যাচ ‘৮৯ (১৯৮৭-৮৮), বিজ্ঞান বিভাগ, সেকশন -এ, রোল নম্বর ৩৫১। প্রথম ক্লাস ছিলো কেমিস্ট্রি ঐ ডিপার্টমেন্টের গ্যালারীতে। শিক্ষক ছিলেন শ্রদ্ধেয় চৌধুরী মঞ্জুরুল হক স্যার। তাঁর প্রথম ডায়লগ ছিলো “আমার নাম চৌধুরী মঞ্জুরুল হক। একজন-ই এই পৃথিবীতে চৌধুরী মঞ্জুরুল হক, আর সেটা আমি”। মিষ্টি মধুর দিনগুলোর কথা মনে এলে এখনো উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে ভেতরটা। কত স্মৃতি, কত কথা! সবুজের সমারোহ আর অপরূপ শোভামন্ডিত বিস্তীর্ণ টিলাভূমি জুড়ে বিশাল ক্যাম্পাস। সুবিশাল প্যারেড মাঠকে ঘিরে আমাদের খেলাধূলা, হোস্টেলগুলোর পাঁচিলে বসে আড্ডা দেয়া, সুপ্রশস্থ মসজিদে নামাজ পড়া। মনে পড়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে কমনরুমে টেবিল টেনিস খেলা, ক্যান্টিনের সমুচা- সিঙ্গারা, ক্লাস চলাকালীন সময়ে গ্যালারীতে মার্বেল ছেড়ে দেয়া, রোল কলে প্রিয় বন্ধুর প্রক্সি দেয়া কিংবা রোল কলের পর ক্লাস পালিয়ে যাওয়া, দুষ্টামীর কারনে ক্লাস থেকে বের করে দেয়া। মেয়েদের দৃষ্টি আকর্ষণের কি প্রাণান্তকর চেষ্টা! দেখা যেতো অনেক কৌতূহলী, উৎসুক দৃষ্টি। আমি ছিলাম ভীরু ও মুখচোরা প্রকৃতির। পরিচিত গন্ডীর বাইরে মিশতাম না।

আমার বন্ধু তান্না (ডাক্তার, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী) গণিতের তাহের স্যারের সুপুত্র। তান্নারা থাকতো কলেজের পূর্বদিকে চন্দনপুরা গেইটের মুখে স্যারদের কোয়ার্টারে। ঐ গেইটের পাশেই ‘গণি কুঞ্জ’, আমার বন্ধু তানভীর (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) -এর বাসা। কাছেই ছিলো আরেক বন্ধু কাজী’র (আমেরিকা প্রবাসী ব্যবসায়ী) বাসা। বিকেলে বা অলস দূপুরে তান্নাদের ছাদে হতো আমাদের সমাবেশ। আমি যেতাম দেওয়ান বাজার সাব এরিয়া থেকে। গোলাম (কানাডা প্রবাসী) আসতো চকবাজার থেকে। টিটু (আমেরিকা প্রবাসী ব্যবসায়ী) দেব পাহাড় থেকে। রানা (ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী) আসতো চকবাজার ওয়াসা কলোনী থেকে। কাজলু (শীপ সার্ভেয়ার) আসতো চান্দগাঁও থেকে। আর কলেজ কলোনীর সৈয়দ জাবিদ হোসেন (বীমা কর্মকর্তা)। আমরা সবাই চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠতে হতো। আমি ভয়ে ভয়ে উঠতাম। এখানেই শেষ নয়। আড্ডা হবে সিঁড়ি ঘরের ছাদের উপরে। আমি উঠতে পারতাম না। আমাকে চালের বস্তার মতো টেনে তোলা হতো। এই ছাদে আমরা ক্রিকেট খেলেছি, ঘুড়ি উড়িয়েছি। আবার, বিল্ডিংয়ের নীচে চলাচলের লম্বা সরু আঙ্গিনায় ক্রিকেট খেলেছি। মারকুটে ব্যাটিং করে স্যারদের বাসার জানালার কাঁচ ভাঙ্গা ছিলো নিত্যদিনের ঘটনা। কাঁচ ভাঙ্গা হলে পালিয়ে যাওয়া। সেদিনের মতো খেলা শেষ। ফিজিক্স গ্যালারীর ছাদেও আমরা ক্রিকেট খেলেছি। ব্যাডমিন্টন খেলতাম ফিজিক্স গ্যালারীর পাশে ছোট আঙ্গিনাতে। দল বেঁধে প্রাইভেট পড়তে যেতাম স্যারদের বাড়িতে বাড়িতে। তবে, যেখানেই থাকিনা কেন, মাগরেবের ওয়াক্তে ঘরে চলে আসতাম।

এভাবেই কেটেছিল আমার কলেজ বেলা। ধীরে ধীরে একসময় চট্টগ্রাম কলেজ হারিয়ে যায় আমার প্রাত্যহিক জীবন থেকে। কিন্তু, রেশটা রয়ে গেছে আজো। আবারো ফিরে যেতে ইচ্ছে করে শাসন বারন আর সোনালী কৈশোরের প্রাণোচ্ছল দিনগুলোতে। আজো আমি পুলকিত হই চট্টগ্রাম কলেজ নামটি শুনলে। বহুদিন হলো ফেলে এসেছি আমার প্রিয় চট্টগ্রাম কলেজকে। জানি,আর ফেরা হবেনা। কারণ, পেছনে ফেরা যায়না। তবু যেন অকূল সময়ে এই ফেরারি মনকে, চট্টগ্রাম কলেজের সোনালী স্মৃতিগুলো কূলে ভেরায়।