ফিনটেক সুস্বাগতম 

Kayesh Chowdhury

Kayesh Chowdhury

Executive Vice President & Regional Head, Corporate Banking, BRAC Bank Limited

কয়েকদিন আগে উন্নয়ন মেলায় ব্যাংকিং স্টলের জন্য একটি ট্যাগ লাইন লিখেছিলামঃ “ডিজিটাল ব্যাংকিং, গতিশীল মাত্রা, সোনার বাংলায় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা।” প্রশ্ন এসে যায়, আমরা কতটুকু গতিশীল মাত্রায় ডিজিটাল ব্যাংকিং করছি?
আলী পে, আলীবাবা, আমাজন, উবার, পাঠাও, ফুড পান্ডা, হাংরি নাকি, হ্যালো লন্ড্রি’র যুগে আমরা কতটুকু প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং করছি? এর গতিশীলতাই বা কতটুকু? FinTech শব্দটি আজকাল শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশে।  এটি হলো ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজি বা আর্থিক প্রযুক্তি। অন্যকথায়, আর্থিক লেনদেনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি। ফিনটেক বললে আমাদের দেশে বিকাশ, রকেট ইত্যাদি’র কথা বলা হয়।
ফিনটেক মানে শুধু মানি ট্রান্সফার নয়। এটি আরো ব্যাপক। বিশ্বব্যাপী গ্রাহকগণ ফিনটেকের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফিনটেক আর্থিক কার্যক্রমকে সহজ করছে। পিটুপি ট্রান্সফার একটি ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম যেটিতে এক ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য ব্যক্তি ঋণ নিতে পারে। ঋণদাতা ব্যাংকে সঞ্চয়ের চেয়ে বেশি লাভ পান। আর, ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের চেয়ে কম   সুদে ঋণ পান। এই পিটুপি প্ল্যাটফর্মে ঋণগ্রহীতার ফিংগার প্রিন্ট, এনআইডি, অন্যান্য তথ্য উপাত্ত আপলোড করা থাকবে যাতে ঋণগ্রহীতার প্রোফাইল বুঝা যায়। প্রযুক্তি নির্ভর হওয়াতে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়।
পেপাল বা অন্যান্য মোবাইল সিস্টেমের মাধ্যমে ইনস্টলমেন্ট পরিশোধ করা যায়। আরেকটি ফিনটেকের কথা বলি। শিশুরা অনেক সময় পুরস্কার বাবদ বা উপহার হিসেবে বা কোনো কাজ করে অর্থ পায়। দাতা স্মার্ট সঞ্চয় ব্যাংকে শিশুর প্রাপ্য টাকা তার হিসাবে হস্তান্তর করতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয় ব্যাংকে বাতি জ্বলে উঠবে। শিশুরা বুঝবে তার ব্যাংকে টাকা জমা হয়েছে। গ্রহীতা শিশু পরবর্তীতে জমা টাকা থেকে খরচ করতে পারবে। ‘আর্নিট’ নামে এই  সিস্টমটি ডেনমার্কে চালু আছে শিশু-কিশোরদেরকে অর্থনৈতিক শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে। মাই ক্যাশ অনলাইন’ মালয়েশিয়ার একটি উদ্যোগ, যার মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিক, যাদের ব্যাংক হিসাব বা ক্রেডিট কার্ড নেই, তারা স্বদেশে টাকা পাঠাতে পারেন।
এছাড়া অনলাইনে কেনাকাটা ও বাসের টিকিট কিনতে পারেন। গ্রাহককে তার নাম-ঠিকানা আইডি দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। ভাউচার কিনে সেবা কেনা যায়। গ্রাহকরা বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে সেবা নিতে পারেন। এজেন্ট ছড়ানো আছে সারা দেশে। মুদিদোকান, রেস্তোরাঁ, সুপারশপ এজেন্ট হিসেবে সেবা দেয়। আবার, অনেক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যখন প্রথমবার ঋণ নিতে চায়, তখন ব্যাংকের পক্ষে তাদের যাচাই-বাছাই করা মুশকিল। কারণ তাদের ঋণ নেয়ার পূর্ব ইতিহাস নেই। সেক্ষেত্রে ‘কনফার্ম-উ’ চ্যাট বটের মাধ্যমে কিছু প্রশ্ন করে গ্রাহকের মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে ঋণ পরিশোধের ব্যাপারে তাদের সদিচ্ছার সম্ভাবনা জানাতে পারবে। টেক্সট মেসেজ থেকে পূর্ববর্তী তিন মাসে গ্রাহকের ব্যয় বা টাকা প্রদানের ইতিহাস জানা যাবে। সোস্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তার যোগ্যতা অনুসারে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা, একই এলাকায় তিনি কতদিন ধরে বাস করছেন ইত্যাদি জানা যাবে। এসব তথ্য ঋণদানের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সহায়ক।
আমাদের দেশে আজকাল মোবাইল এ্যাপস্-এর মাধ্যমে ইউটিলিটি বিল, মোবাইল টপ আপ, ইন্সুরেন্স প্রিমিয়াম,  স্কুল ফী, ক্লাব ফী ইত্যাদি আমরা ব্যাংক একাউন্ট থেকে পে করছি। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে বিকাশ, রকেট বা এ ধরনের প্ল্যাটফর্মে ক্রস পেমেন্ট করা যাচ্ছে।আকাশপথের টিকেট কেনার জন্য AMY নামে একটি সফটওয়্যার চালু আছে। এটিতে গ্রাহককে একটি ক্রেডিট লিমিট দেয়া থাকে। ক্রেডিট লিমিটের আওতায় গ্রাহক আকাশপথের টিকেট কিনে। বিল এলে গ্রাহক তা পরিশোধ করে। মোবাইল ব্যাংকিং এরই মধ্যে অর্থ স্হানান্তরের ক্ষেত্রে গ্রামীন জনজীবনে ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। এই মোবাইল ব্যাংকিং-এর ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাপক আকারে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্জন সম্ভব। গরিব মানুষরা যখন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অথবা মোবাইল পেমেন্ট ব্যবহার করার সুযোগ পায় তখন তারা প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত হয়। তাদের জীবনপথে গতিশীলতা আাসে। অভিভাবক যদি সহজে ফি পরিশোধ করতে পারে তাহলে সন্তানের শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে মনোনিবেশ করার সুযোগ পায়। নারীরা ব্যবসা শুরু করতে বা সম্প্রসারনে আরো উৎসাহী হয়। গরিব গৃহকর্তারা শস্য খারাপ হওয়া, অসুস্থতা অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আরও ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিছু ব্যাংক ইতিমধ্যে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে। ফলে, প্রযুক্তি নির্ভর ব্যাংকিং -এর পরিধি বাড়বে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে যাবে।
হাতের মুঠোয় তাৎক্ষণিক লেনদেন সুবিধার পাশাপাশি অন্যান্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ের তুলনায় বেশি অর্থ উত্তোলন সুবিধা থাকায় দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’। গ্রাহকদের দ্রুত অর্থ লেনদেনের সেবা দিতে ডাক বিভাগের অধীনে ১ অক্টোম্বর যাত্রা শুরু করে নগদ। এর মধ্যে ২৯ দিনে সারা দেশে প্রায় ৩৫ হাজার আউটলেট উদ্যোক্তা তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া আগামী দুই বছরে আরও দুই লাখ উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নগদ।
ব্যাংক তার গ্রাহককে ব্যাংকে বা পু্ঁজিবাজারের বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করে, প্রত্যাশিত মুনাফা, ঝুঁকি বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে থাকে। ফলে, গ্রাহকের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত সহজতর হয় ও স্মার্টলি পোর্টফোলিও হ্যান্ডেল করতে পারে।
হয়রানি ও জটিলতা কমাতে কৃষি ও পল্লিঋণ প্রদান কার্যক্রমের ক্ষেত্রে সহজীকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব শাখার ব্যবস্হাপক মো. জসিম উদ্দিন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনলাইন কৃষি ও পল্লিঋণ এটুআই প্রোগ্রামের চট্টগ্রাম জেলার প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও পালন করছেন। এটি প্রচলিত পদ্ধতি থেকে আলাদা। এটি মূলত ডিজিটাল ও অ্যাপভিত্তিক কৃষিঋণ প্রদানের সহজ পদ্ধতি। এতে পছন্দের ব্যাংক থেকে ঋণ সম্পর্কে হালনাগাদকৃত তথ্য-উপাত্ত (যেমনঃ সুদের হার, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসমূহ) তালিকা পাওয়া যাবে। কৃষকের পছন্দসই ব্যাংকে অনলাইনে আবেদন করা যাবে। ব্যাংকে না গিয়েও মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে যে কোনো স্হান থেকে যে কোনো সময় ঋণের জন্য আবেদন, ঋণের কিস্তি, প্রদানের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখসহ যাবতীয় তথ্য এসএমএস’র মাধ্যমে জানার সুবিধা রাখা হয়েছে।
উন্নত অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য যুগান্তকারী ধারণাগুলোর মতোই ফিনটেক-এর সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিক অন্তভুক্তি সক্ষম, অনেক সীমাবদ্ধতাও এর মাধ্যমে দূর করা সম্ভব। ফিনটেক আর্থিক সেবাসমূহতে বৈপ্লবিক এক্সেস দিচ্ছে। ফিনটেককে ব্যাংক কীভাবে গ্রহণ করছে বা করবে, তার ওপর নির্ভর করবে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ আর্থিক সেবার জগৎ। আমাদের দেশের ব্যাংকগুলোকে ফিনটেক লেনদেনের সাথে তালমিলিয়ে চলতে হবে এবং নুতন নুতন উদ্ভাবনী প্রোডাক্ট চালু করতে হবে। শুভস্ব শীঘ্রম।