এ.এন.এম. খালেদ চৌধুরী, আমার বাবা, পেশায় আইনজীবি ছিলেন। উনার জন্ম ২১শে মে, ১৯৪০ ইংরেজি সন। আমার বাবা কখনোই আমার খুব কাছে ছিলেন না। আমার মা -কেই ঘিরে আমার পৃথিবী। বাবা আর আমার মাঝে হাল্কা পাতলা হলেও অদৃশ্য একটা দেয়াল ছিলো- খানিকটা দূরত্ব, সংকোচ, ভীতি। তবে, সেই বাবার মাঝেই খুঁজে পেতাম পর্বতসম নির্ভরতা আর নিরাপত্তা। আব্দার ও করতাম, পূরণ ও হতো। ভালোবাসতেন, স্নেহ করতেন – অবশ্যই। ১৯৮৯ ইংরেজি সনে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে আমার বাবা এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগে বেশ কিছু সময় শারীরিকভাবে বিভিন্ন অসুখে ভুগেছেন।
সেভাবে হয়তো কাছে যাওয়া হয়নি আমার। আর সে কারনেই কষ্টটা, আফসোসটা হয়তো একটু বেশীই। হাতে গোনা কয়েকবার বাবার সাথে আমি একা এদিক-ওদিক গিয়েছি। একবার গিয়েছিলাম কক্সবাজারে। ছোটমামাও গিয়েছিল আমাদের দু’জনের সাথে। যাওয়া হয়েছিল মূলতঃ আমার বাবার পেশাগত কারনে। কক্সবাজার কোর্টে কোনো একটি মামলায় উনাকে আইনজীবী হিসাবে নেওয়া হয়েছিল। মাঝেমাঝে বাবাকে এইরকমভাবে চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে যেতো কোনো কোনো ক্লায়েন্ট। হোটেল সায়মন তখন পুরানো লোকেশনে। একদিন, বাবা আমাকে মিক্সড গ্রীল খাওয়ার জন্য বললেন। এটা বেশ মজার একটা খাবার আর আমি খেয়েছিলামও তৃপ্তি নিয়ে। সেই থেকে ওটা আমার প্রিয় একটা খাবার। আমি বিয়ে করার পর কক্সবাজার গেলে যুথীকেও ওই খাবারটি খাইয়েছিলাম। আসল কথায় আসি, বাবা কোর্টে যাওয়ার পর আমি আর ছোটমামা রুম সার্ভিসে এমনভাবে খাবার অর্ডার করতে থাকলাম, বয়- বেয়ারারা অবাক হয়ে গেল। হোটেল ছাড়ার সময় বিল দিতে গিয়ে অবাকই হয়েছিলেন। কিন্তু, আমাকে কিছুই বলেননি। সপ্তাহে অন্তত একদিন বিরিয়ানি বা চাইনিজ খেতাম। বাবা চেম্বার করছেন, আমি একটা স্লীপ লিখে পাঠিয়ে দিতাম। বাবা উনার সহকারী সালাম মামাকে পাঠিয়ে এনে দিতেন। একবার বাবার সাথে ঢাকা গিয়েছিলাম আর এন্ড কোং -এর বাসে- যথেষ্ট খেয়াল রেখেছিলেন আমার। তখন ঢাকায় গ্রামীণ ব্যাংকের অফিস হয়ে গিয়েছে। প্রফেসর ইউনুস ওই অফিসেই বসতেন। আমার বাবা আর ইউনুস সাহেব বন্ধু ছিলেন। একসাথে কলেজিয়েট স্কুল আর চট্টগ্রাম কলেজে পড়েছেন।
‘দুপাতা’ নামে একটা ম্যাগাজিন দুইজন মিলে পাবলিশ করতেন। বাবা, ইউনুস সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলেন, আমাকেও নিয়ে গেলেন। একটা দু’তলা ভবন। উপর তলায় ইউনুস সাহেব বসতেন। বিল্ডিং’টার পাশে ছাউনি দিয়ে কয়েকটা গরুও রাখা ছিল। মেঠো পথ পেরিয়ে আমরা যখন গেলাম, তখন ইউনুস সাহেব প্রাতঃরাশ করছিলেন চেম্বারে বেতের পার্টিশন দিয়ে আলাদা করা স্হানে। অল্পসময়ে ছুঁটে এলেন। আমার বাবা স্বপ্ন দেখতেন ছেলেকে ডক্টর ইউনুসের মত অর্থনীতি’র শিক্ষক বানাবেন। গাড়ী চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গিয়ে ক্লাস নেবে তাঁর একমাত্র ছেলে-আমাকে বলতেন ছোটবেলা থেকে। তাই ডক্টর ইউনুসের প্রতি আমার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়েছিলাম উনার দিকে, আমাকে যার মত হতে হবে, এমন একজন মানুষ, আমার সামনে। আমি তখন প্রাইমারী স্কুলের গন্ডি পার করিনি। পরের ইতিহাস তো সবার জানা। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্সেও ভর্তি হইনি, তাড়াতাড়ি পাস কোর্সে ডিগ্রী পাস করে চাকুরী করার জন্য। তাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন অতিথি বক্তা হিসাবে আমাকে ডাকে, আমি ছুটে যাই। ইউনুস সাহেবের ওখানে বেশকিছু সময় আমরা ছিলাম। উনাদের দুইজনকে নাকি ‘শ্বশুর- জামাই’ ডাকা হতো। কেনো, তা অবশ্য আমাকে বলেননি।
আমার মনে আছে, আমি বলেছিলাম, গ্রামীণ ব্যাংক নাম বলে কি এখানে আসার রাস্তাটা গ্রামের মতো মেঠোপথ! উনারা আমার কথা শুনে প্রচুর হেসেছিলেন। পরবর্তীতে, ইউনুস সাহেবের সাথে বাবার আর দেখা হয়েছিল কি-না আমার আর জানা নাই। তবে, আমার বিয়েতে আমি উনাকে নিমন্ত্রণ কার্ড পাঠিয়েছিলাম হাতে লেখা একটি চিঠি সংযুক্ত করে। উনি সময়োভাবে উপস্হিত থাকতে পারবেন না উল্লেখ করে রিপ্লাই করেছিলেন। চিঠিটাতেও ওই ‘শ্বশুর-জামাই’ প্রসঙ্গটিও উল্লেখ করছিলেন। চিঠিটা ফেসবুকে হয়তো কখনো পাবলিশ করবো। প্রাইমারীতে সেন্ট মেরীস স্কুলে পড়ার সময় গাড়িতে করে আমাকে স্কুলে পাঠানো হতো। সেকেন্ডারীতে যখন চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় বাবা গাড়ি চড়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। স্কুল শেষে হেঁটে বাসায় ফেরার হুকুম দিলেন। আমি যেভাবে ননীর পুতুলের মতো বেড়ে উঠছিলাম, বাবার এই সিদ্ধান্ত উনার মৃত্যুর পর আমার জন্য পজেটিভ হয়েছিলো। বাবা যখন দুপুরে বিশ্রাম নিতেন, আমাকে বলতেন উনার পিঠের উপর হাটতে। উনি খুব খুশী হতেন এটাতে। কোর্ট বিল্ডিং এ মিলাদুন্নবীতে একবার উনার সাথে গিয়েছিলাম। প্রচুর জনসমাগম হয়েছিল। আমরা চাপাচাপিতে পড়ে গেলাম। আমার যাতে কষ্ট না হয়, সেজন্য উনি আমাকে আগলে রেখেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে আমাকে তিনি কর এন্ড কোং’র গোপাল ভোগ, কমলা ভোগ নামের বিখ্যাত মিষ্টি খাইয়েছিলেন। বাবা খুব টি.ভি দেখতে পছন্দ করতেন, বিশেষ করে কার্টুন ছবি। একবার বাবার চেম্বারে ঐসময়ের এক পরাক্রমশালী লোক এলো।
আমি গিয়ে উনাকে বললাম সে কথা। বাবা আমাকে বললেন, উনাকে বসতে বলার জন্য। বাবা পুরো কার্টুন ছবিটা দেখা শেষ করে চেম্বারে গিয়েছিলেন। আরেকদিন, গিয়েছিলেন আমাকে সেন্ট মেরীস স্কুল থেকে আনতে। ঐ সময়ের দুর্ধষ আরেক লোক মোটর সাইকেল থামিয়ে বাবাকে পায়ে ধরে সালাম করলো প্রকাশ্য রাস্তায়। আমি অবাক হয়ে চেয়ে থাকলাম। বাবা গল্প করতে খুব পছন্দ করতেন। সমবয়সী ছাড়াও প্রফেসর আসহাবউদ্দীন, আজাদী সম্পাদক মোহাম্মদ খালেদ, মরহুম এয়ার আলী খান পেচু মিয়া’র মত আরো অনেকের সাথে আমি তাঁকে দেখেছি ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতে, হাস্সোল্লাস করতে। লায়ন্স করতেন। লায়ন্স জেলা ৩১৫ বি-এর কনস্টিটিশন উনার প্রণীত। আজাদী সম্পাদক জনাব এম.এ. মালেক আর নবারুন মোটরস-এর শফিউর রহমানের সাথে বেশ ঘনিষ্টতা ছিলো। সুনীল নামের এক ইলেক্ট্রিশিয়ান আমাদের বাসায় কাজ করতো। একদিন তাকে ভালো ও মূল্যবান একটা ঘড়ি দিয়ে দিলেন। টাকা-পয়সা চেয়ে কেউ কোনোদিন খালি হাতে ফেরত যাননি। আমি যখন ডাচ বাংলা ব্যাংক মুরাদপুর শাখার ম্যানেজার, তখন প্রচুর জনসংযোগ ছিল আমার কারণ ওটা ছিলো রিটেইল বেইজড্। বিভিন্ন সময়ে আমার পরিচয় জানার পর প্রচুর লোকজন বাবাকে চেনার কথা বলেছেন যাদেরকে আমি আগে চিনতাম না। এদের প্রত্যেকে বাবাকে ভালোমানুষ হিসাবে অভিহিত করেছেন। তারমধ্যে, চারজন মানুষ আমাকে বলেছেন, বাবা তাদের মামলা বিনা ফী’তে পরিচালানা করেছেন। এদের একজন আবার বর্তমান সরকারের এর আগের টার্মে মন্ত্রীও ছিলেন।
আমার জানামতে বেশ কিছু মামলা বাবা বিনা ফী’তে পরিচালনা করে দিয়েছিলেন।আমার বাবা চট্টগ্রাম আইন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন- চুক্তি আইন পড়াতেন। আইন বই লিখেছিলেন চারটি।মাস্টারদা সূর্যসেন-এর রায় নিয়ে লিখা শুরু করেছিলেন। কিন্তু, কাজটা শেষ করতে পারেননি। আইনজীবী সমিতি বা বার কাউন্সিলের নির্বাচনে বাবা বেশ কয়েকবার অংশগ্রহণ করেছেন। প্রত্যেকবারই জয়ী হয়েছেন। শেষ নির্বাচনটিতে অসুস্থতাজনিত কারনে বাবা ক্যাম্পেইন করতে পারেননি। তারপরও প্রাক্তন মন্ত্রী হাসান মাহমুদের বাবা শ্রদ্ধেয় মরহুম নুরুস্সফা তালুকদার, বাবার সাথে ভোটযুদ্ধে জয়ী হতে পারেননি। আইনজীবী সমাজেও বাবা এতোটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর মৃতদেহ আমাদের কোর্ট বিল্ডিং এ নিয়ে যেতে হয় এবং তাঁর জানাজা একবার হয়ে যাওয়ার পর সম্মানিত আইনজীবীগন নিজেরাই উদ্দ্যোগী হয়ে আরেকটি জানাজা লালদিঘী মাঠে পড়েন। মোট তিনটি জানাজা পড়া হয়েছিল আর প্রচুর শুভানুধ্যায়ী এই জানাজাগুলিতে অংশ নিয়েছিল।
বাবাকে চিকিৎসা করানোর জন্য অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পথে কুমিল্লা’র কাছাকাছি কোনো জায়গায় ইন্তেকাল করেন। তিনি জানতেন আমার পরীক্ষা খুব সন্নিকটে।যাওয়ার আগে বলেছিলেন, উনি মারা গেলও আমি যেন পরীক্ষা বন্ধ না করি। আর বলেছিলেন, উনি মৃত্যুকে ভয় পান না কারণ উনি কারো কখনো ক্ষতি করেননি বা কারো অশুভ কামনা করেননি। “এতো রক্তের সাথে রক্তের টান স্বার্থের অনেক উর্ধ্বে, হঠাৎ অজানা ঝড়ে তোমায় হারালাম, মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল, বাবা কতদিন, কতদিন দেখিনা তোমায়”- এ যেনো আমার মনের কথা। বাস্তবতা হলো, আমার বাবা’র লাশ যখন আমাদের বাসায় এলো আমি অনেকটা সময়ই না দেখে ছিলাম। আমার অভিমান হলো। মনে হলো, আমার নির্ভরতা আর নিরাপত্তা’র স্হানটি আর রইলো না। আমি তখন এইচ. এস. সি. পরীক্ষা দেবো। আমি আমার বাবা মা- এর একমাত্র ছেলে। আমার একমাত্র বোন আফ্রিনা ক্লাস সিক্স -এ পড়ে। আমার মাঝে উথালপাতাল হয়ে গেলো।
একসময়, বাবা’র জানাজা পড়ার সময় আমাকে যখন সকলের সামনে দাঁড় করানো হয়, তখন আমি অনুভব করলাম, আমাকে বিরাট দায়িত্ব নিতে হবে। আমার বাবা আমাকে শিখিয়ে যাননি কিভাবে জীবন পথে চলতে হয়!! উনাকে দেখেছি আর অনুসরণ করার চেষ্টা করছি মাত্র। আমার বাবাকে যখন আমাদের গ্রামের মাটিতে কবর দিয়ে বাসায় ফিরলাম, তখন মনে হলো, কোনোভাবে পরীক্ষাটা শেষ করে নিই। তারপর, বাবা’র কবরের পার্শ্বে গিয়ে থাকবো। পরীক্ষা তো শেষ হলো, আমার আর ওইভাবে গিয়ে থাকা হলোনা। এরপর, প্রায়ই কবর জেয়ারতে যেতাম। একসময়, আস্তে আস্তে কমে গেলো যাওয়া। এখন আরো কম। তবে, যখনই নামাজ পড়ি, কবর জেয়ারত আমি সবসময়ই করি। যেটা বলতে চাইছিলাম, নিষ্ঠুর এই পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু থেমে থাকেনা। তবে, নুতন কিছু বাঁক তৈরী হয়, নুতন কিছু উপলব্ধি, যা জীবনকে শানিত করে, রিদ্ধ করে। এমনি করে, আমার ছেলেরাও হয়তো একদিন আমাকে ভুলে যাবে। আমিও হারিয়ে যাবো স্মৃতির অতল গহ্বরে। পরিশেষে, পবিত্রতম ভাষায় আরো একবার বলি ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন; যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’ আমিন!!
