অভিমানী মা আমার! একদম সময় দিই না। গলায় জড়িয়ে বলি না, আমি তোমাকে ভালোবাসি মা। হয়তো জানতে চাওয়া হয় না, তোমার দিনটা কেমন কাটলো। অথবা, তোমার পিঠের ব্যথা কি সেরেছে.. বলি না। কেন বলি না বা কেন বলা হয় না – তা নিজেও জানিনা।
মা বলেন, নিয়মিত নামাজ পড়তে, আমি অনিয়মিত। প্রতিনিয়ত মায়ের খুব ছোট্ট একটা চাওয়া থাকে.. সকাল বেলা ওনার পাশে বসে খবরের কাগজে চোখ বুলানো, তাঁর সাথে একটা-দুইটা কথা বলা.. আমার বসা হয় না। মা চান, ছুটির দিনে আমি তাঁর পাশে বসে গান শুনি, টিভি দেখি.. আর আমি অন্য রুমে গিয়ে শুয়ে-বসে সময় কাটাই অথবা বাইরে বেরিয়ে যাই। মা বলেন, তাঁর সামনে যখন থাকি, তাঁর সাথে যখন কথা হয় তখন যেন মোবাইলে চোখ না রাখি, কিন্তু এই সময়ও আমার আঙ্গুলগুলি মোবাইলের স্ক্রিনে খেলতে থাকে। মা চান, আমি প্রতিদিন একটু করে অফিস থেকে তাঁর খোঁজ-খবর নিই। দুপুরে খেলেন কি-না বা কি খেয়েছে, জানতে চাই, কিন্তু আমি আমার ব্যস্ততায় ডুবে থাকি। মা প্রতিদিন আশা করে থাকেন তাঁর ছেলে সন্ধ্যের পর বাসায় ফিরে তাঁর খাটের পাশে ইজি চেয়ারে বসে তাঁর সারাদিনের জমানো গল্পগুলো শুনবো আর আমি দেরি করে বাড়ি ফিরি। প্রতিদিন ওভাবে সময় নিয়ে বসাও হয় না।
আমার একমাত্র বোনটা থাকে দেশের বাইরে। মা চান, আমি তাঁর কন্যার কথা জানতে চাই। সত্যি কথা বলতে কি বোনের খবর আমার নেয়া হয় না। মা সবসময় উৎকন্ঠায় থাকেন, একমাত্র মেয়ের জন্য, আমার জন্য- আমাদের জন্য।
সংগ্রামী মা আমার! ধনী পরিবারে জন্ম নেয়া মা, অল্প বয়সে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় বিয়ে হয়ে যায় একান্নবর্তী পরিবারে। শুরু হয়ে গেলো নিজেকে মানিয়ে নেয়ার সংগ্রাম। সুখ, স্বচ্ছলতা যখন ছুঁই ছুঁই, তখন আমার বাবার শরীরটা খারাপ হয়ে গেলো।
দীর্ঘ আট বছর বিভিন্ন রোগে ভুগে আমার বাবা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। এই আট বছর আমার মা দিনে-রাতে বাবার সুস্থতার জন্য ডাক্তার, ক্লিনিক, হাসপাতালে, দেশে-বিদেশে ছুটেছেন, প্রাণপণে সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। বাবা যখন আমাদের ছেড়ে গেলেন, তখন আমার মায়ের বয়স পয়ত্রিশ, আমি তখন এইচ.এস.সি. পরিক্ষার্থী আর আমার বোন ক্লাস সিক্সে। আমাদের নিয়ে শুরু হয়ে গেলো মায়ের অন্য এক সংগ্রাম, বেঁচে থাকার সংগ্রাম। ছেলে-মেয়েকে মানুষ করে গড়ে তোলার সংগ্রাম। ছেলে আজ একজন ব্যাংক কর্মকর্তা – চট্টগ্রামে একটি বেসরকারি ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধান। মা স্বপ্ন দেখেন, তাঁর ছেলে আরো বড়ো কর্মকর্তা হবে। এক নামে সবাই চিনবে, জানবে। কন্যাটিও পেশায় একজন ডাক্তার, মধ্যপ্রাচ্যে একটি দেশে ওখানকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। দূরদেশে তার ডাক্তার স্বামীর সাথে থাকে। ইচ্ছে করলেই বুকে টেনে নিতে পারেন না। সেই দুঃখটাও তাঁর সীমাহীন।
সম্পদের প্রাচুর্যতায় হয়তো মোড়ানো নয় আমার মায়ের জীবন। বুকে অনেক অভিমান। মনে উঁকি দেয় পাড়ি দেয়া সময়ের সংগ্রামের ছবি। তারপরও, আলহামদুলিল্লাহ, শোকরান আল্লাহ, আমার মা ভালো আছেন। সংগ্রাম আজো চলছে আমার মায়ের। এখন আছেন আমার সন্তানদের নিয়ে। ওদের জ্বালাতনে, নখরামিতে উথাল-পাতাল আমার মায়ের জীবন। ছেলে, ছেলে বৌ- দু’জনই চাকুরে। তাই, পুরো সংসারের ধকলটা যায় আমার মায়ের উপর।
কেমন সন্তান আমি! আমি নিজেই জানি না! হয়তোবা দায়িত্ববান সন্তান নই , অথবা উদাসীন। তবে, আমার প্রতিদিনের জীবনটা আমার মাকে ঘিরেই। মা আছে বলেই আমার জীবন এতো সুন্দর। আমার শান্তি, আমার স্বস্তি, আমার ভরসাস্থল- আমার মা। মায়ের স্নেহ, ভালোবাসায় গড়া আমার এই জীবন। মা আমাকে পথ চলতে শিখিয়েছেন, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন। একবার না, বারবার বলবো। চিৎকার করে বলবো, আমি তোমাকে ভালোবাসি, মা। অনেক ভালেবাসি। অনেক, অনেক ভালোবাসি তোমায়….
