“মনে পড়ে যায় আমার সোনালী কৈশোর, ফেলে আসা দিনগুলোর হারানো সেই সুর” – ছাত্র হিসেব আমি বরাবরই মাঝরি গ্রেডের। ক্লাস সেভেন -এ ষান্মাসিক পরীক্ষায় “তোমার প্রিয় কবি” শীর্ষক রচনা লিখতে বলা হয়েছিল। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের তারণ্যের জয়গান ও উদ্দীপনামূলক লেখনী আমার পছন্দ। তাই তিনি আমার প্রিয় কবি। এরপর উনার জীবন ও লেখনী সমগ্রের কথা লিখেছিলাম। পরীক্ষার খাতা যখন দেখতে দেয়া হলো আমার চোখ তো ছানাবড়া। বাংলা রচনায় ‘শূন্য’ পেলাম। পরীক্ষার খাতার উপর লাল কালিতে লিখা ছিল “প্রিয় কবি বলতে কবির জীবনী বোঝায় না”। বাংলা রচনা লিখে কেউ আজ পর্যন্ত শূন্য পেয়েছে কিনা জানিনা। তবে, আমি পেয়েছিলাম। এটাই সত্য। এই সময়ে বহুল প্রচলিত দৈনিকে আমার লিখা প্রবন্ধগুলি প্রকাশিত হয়, প্রাবন্ধিক হিসাবে সম্মানিত হই। হয়তো ওই সময়ে শূন্য পেয়েছিলাম বলে এখন তার পুরস্কার পাচ্ছি।
বনেদী সেন্ট মেরীস্ স্কুলে আমার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শেষ হলে মাধ্যমিকে আমি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবো, সে প্রশ্ন এসে দাড়ালো। আমার আব্বা কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র, আমার মেঝো চাচা সেন্ট প্লাসিডস্ আর ছোট চাচা মুসলিম হাই স্কুল। আব্বা সিদ্ধান্ত দিলেন, আমাকে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (সাবেক এম.ই. স্কুল) -এ পড়তে হবে। আমার আব্বার বন্ধু ড. মুহাম্মদ ইউনুস নাকি এম.ই. স্কুলে পড়েছিলেন আর পরে কলেজিয়েট স্কুলে। সেন্ট প্লাসিডস্ স্কুলের ভর্তি বাতিল করে আমাকে চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে এ ভর্তি করানো হলো। মনটা খারাপই হয়ে গেলো কারণ বন্ধুরা সব সেন্ট প্লাসিডস্ -এ ভর্তি হলো। অন্যদিকে, আমি সরকারি স্কুলে। ততোটা ছিমছামও না, শিক্ষকেরা বড় বড় বেত দিয়ে পেটান। ফলাফল দাড়ালো, প্রথম ষান্মাসিকে অংকে তেত্রিশ দিয়ে শুরু। সেন্ট মেরীসে গাড়ী করে স্কুলে যেতাম। এই স্কুলে এসে আব্বা গাড়ী চড়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলেন। স্কুল শেষে হেঁটে বাসায় ফেরার হুকুম এলো। আমি যেভাবে ননীর পুতুলের মতো বেড়ে উঠেছিলাম, আব্বার এই সিদ্ধান্ত উনার মৃত্যুর পর আমার জন্য পজেটিভ হয়েছিলো। তান্না, ইসতিয়াক সবুজ, মামা আছিফ জুয়েল আমার সাথে সেন্ট মেরীসে পড়তো। তান্নার বন্ধু তানভীর, টিটু, কাজী একসময় আমারও বন্ধু হয়ে গেলো। প্রথম দিকে যোগ হলো বাবু, শওকত, কাজলু, রানা। পরে যোগ হলো রজত, রাহাত, সোহেল, অঞ্জন, বাপ্পী। শিক্ষকদের মধ্যে কোব্বাদ স্যার, ওয়াহিদ স্যার, রনজিৎ স্যার, কুঞ্জু স্যারের স্নেহ, ভালোবাসা আর বন্ধুদের সারল্য, সহজ উঠা-বসা, খেলাধূলা- আস্তে আস্তে আমার মন বসতে শুরু করলো। আমি আবারো ডানা মেললাম। খুব ভালো না হলেও মাঝারী মানের রেজাল্ট আসতে শুরু করলো। উপস্থিত বক্তৃতায় প্রথম হয়ে গেলাম একবার। রচনা লেখা প্রতিযোগীতায়ও স্কুলকে প্রতিনিধিত্ব করলাম বিভাগীয় পর্যায়ে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান গাইতে গেলাম একবার। জাহেদ আলী যুবরাজ ভাই এতো ভালো গান গায়, আমি পাত্তাই পেলাম না।
একদিন স্কুল কামাই করলাম। পরদিন ওয়াহিদ স্যারের পিটুনী খেতে হবে। আমার আম্মা, খালা স্কুলে গিয়ে হাজির, যাতে আমাকে পিটুনী দেয়া না হয়। স্কুলের বর্তমান মূলভবন তখন নির্মানাধীন। আমরা ঐ সময়টায় চট্টগ্রাম কলেজের রেড বিল্ডিং -এ ক্লাস করতাম। ওয়াহিদ স্যার আর মোস্তফা স্যারের কাছে পুত্রসম স্নেহ পেয়েছি। দু’জনই খুব ভালো বাংলা আর ইংরেজী পড়াতেন। মোস্তফা স্যারের কাছে আমার ছোট বোন ব্যাচে পড়তো। আমার বাবার মৃত্যুর পর উনি টিউশন ফি ছাড়াই আমার বোনকে পড়িয়েছিলেন। মনে পড়ে, কুঞ্জু স্যারের ‘ডিসকো মাইর’ অজিত স্যারের ‘জুলফি টানা মাইর’। ইউনুস স্যার পিটুনী দেয়ার সময় ছাত্ররা ‘স্যার স্যার’ বলে চিল্লাতো আর উনি বলতেন “ন’স্যার ন’স্যার”। পোদ্দার স্যার পেটের চামড়া টানতে টানতে বলতেন “আম্মাজী আজকে ভাত দেয় নাই” – রনজিৎ স্যার বলতেন ‘কিতারে বাছো না’ – এখনো জানি না এর অর্থ কি ? বি. বি. দত্ত স্যার রেগে গেলে জানতে চাইতেন “এই তোমার নাম কি ? তোমার বাবার নাম কি ?” অজিত স্যার খুব ভালো বিজ্ঞান ও গণিত পড়াতেন। আরেকজন অভিজ্ঞ বিজ্ঞান-গণিতের শিক্ষক স্পীনার খ্যাত মোহাম্মদ আলী স্যার আমাকে খুব বেশী স্নেহ করতেন। আমরা উনার কাছে প্রাইভেট টিউশন নিতাম – ব্যাচে পড়তাম। তখন ‘The A Team’ নামে জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল চলছিলো। আমরা আমাদের ব্যাচের নাম দিয়েছিলাম The Ali Team । প্রধান শিক্ষক ছিলেন রবিউল স্যার-নিপাট ভদ্রলোক। পরবর্তীতে হুরমত বানু আপা। দুজনই খুব দক্ষতার সাথে স্কুল পরিচালনা করতেন। স্কুল পরিচালনায় আরেকজন দক্ষ শিক্ষক ইংরেজীতে পারদর্শী মোসলেহউদ্দীন আহমদ স্যারের ডাল দিয়ে মেখে ভাত খাওয়ার গল্প আর ট্যাংরা মাছের (গুইল্লা) খাদ্য গ্রহণের গল্প মনে করে হাসতে থাকি আমরা বন্ধুরা প্রতিটি আড্ডাতে।
নির্মান স্কুল ক্রিকেট শুরু হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই আমাদের সময়ে ১৯৮৫ আর ১৯৮৭ তে স্কুল দু’বার চ্যাম্পিয়ান হলো। এরপর আরো বহুবার অবশ্য চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। প্রথমবার ক্যাপ্টেন ছিলেন আজকের আইটি বিশেষজ্ঞ মোতালেব মাসুদ ভাই আর দ্বিতীয়বার ক্যাপ্টেন ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে -এ বসবাসকারী FAO -এর কর্মকর্তা আমার বন্ধু নাফিজ খান রজত। নির্মান স্কুল ক্রিকেটকে ঘিরে কত উত্তেজনা, আনন্দ, উল্লাস। সংঘর্ষও হয়েছে। নাসিরাবাদ স্কুলের ছেলেদের একবার বেধরক পেটানো হয়েছিলো বাঁশ দিয়ে আগেরকার কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে।
আমাদের স্কুলের নিজস্ব বড় কোন মাঠ না থাকায় টিফিন পিরিয়ডে ক্লাস রুমে শিক্ষকদের টেবিলে বই দিয়ে নেট বানিয়ে টেবিল টেনিস খেলা হতো। আবার, বারান্দায় পিং পং বল দিয়ে আমরা ক্রিকেটও খেলতাম। কাজলুর বিধ্বংসী স্পীন আজো ভুলিনি। দিনগুলি আসলে কতইনা রঙ্গীন ছিলো। খোলামন ও প্রানোচ্ছল হাসিতে ভরা ছিল দিনগুলি। আমরা যেন একঝাঁক প্রজাপতি। আমাদের স্কুলের উল্টো দিকে চট্টগ্রাম কলেজ, আর মহসীন কলেজ পাশে। দু’টোই কোএডুকেশন ফরমেটের। কিশোর মন তখন কখনো শান্ত দিঘীর মতো শীতল আবার কখনো বাঁধ ভাঙ্গা উত্তাল ঢেউ। ক্রমেই অনুভবের পরশগুলি ডানা মেলতে শুরু করলো। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলো শাহ জহিরুল ইসলাম, যে সময়ে সময়ে রাজস্বাক্ষীতে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের পিটুনী খাওয়াতো। গোলাম, মামা খালেদ – এরা যেমন ছিলো মেধাবী তেমনি চরম দুষ্ট। একবার দলবেঁধে পুরো ক্লাস স্কুল পালালাম। পরদিন যথারীতি কয়েকটা বেত ভাঙ্গা হলো। হিন্দু-মুসলিম ফুটবল ম্যাচ ও খেলেছি আমরা, কতোই না ছেলে মানুষ ছিলাম। টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে সম্মানিত শিক্ষকগন আসতেন আমাদের ক্লাস নিতে তাদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে। ঐ সময়টা ছিলো আমাদের জন্য বেশ উপভোগের। উনাদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা ছিলো আমাদের জন্য মূল্য উদ্দেশ্য। টিফিন পিরিয়ডে বরফকুচিতে সিরাপ দিয়ে বানানো গোলা আইসক্রিম ছিলো আমার প্রিয়। নাইন/টেন এ টিফিন পিরিয়ডে চকবাজার গুলজার সিনেমার কাছে একটা ছোট ঝুপড়ি রেস্টুরেন্টে গিয়ে আমরা উনুন থেকে নামানো গরম গরম ফুল্লী ফুল্লী নান আর ঝাল দিয়ে রান্না করা ডাল খেতাম। স্বাদ যেনো এখনো জিভে লেগে আছে। খরচ হতো চার টাকা। গুলজার মোড়ে এখন যেখানে টক দই বিক্রি করে রেস্টুরেন্টটা ছিলো ওই জায়গায়। পকেটে বেশী টাকা থাকলে আরেকটু সামনে এগিয়ে বিরতি রেস্টুরেন্টে গিয়ে আলুর চপ খেতাম।

ছোট এই জীবনে আয়ুটা আরো ছোট। স্কুল থেকে পিকনিকে গিয়ে আমাদের বন্ধু নওশাদ নোটন চন্দ্রঘোনায় লেকের পানিতে ডুবে মারা যায়। ওই পিকনিকে আমিও যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু আব্বার পারমিশন না পেয়ে আমি যেতে পারিনি। হারিয়েছি আমার বন্ধু ইশতিয়াক সবুজকে -পৃথিবীর উপর যার ছিল ভীষন অভিমান। নোটন ও সবুজ দু’জনই ছিল মা-বাবার একমাত্র পুত্র সন্তান। আমরা হারিয়েছি আমাদের সতীর্থ মাসুদ আহমেদ তারেককে। আমরা এদের কাউকে ভুলিনি। আমাদের যেকোন মিলনমেলায় এদের স্মরণ করবো না – তাও কি হতে পারে ? তাদের বিহেদী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
শৈশব থেকে কতো বন্ধুই না এসেছে আমাদের জীবনে। কিন্তু স্কুলের বন্ধুরাই এখনো আমাদের চারপাশে – এ যেনো সম্পাদিত কোন চুক্তিপত্র। জীবনের একটি বিশাল সময় স্কুলে কাটে। এজন্য স্কুল বন্ধুদের সাথে আর আরো তুলনা হয় না। স্কুল জীবনকে ভুলিনি। বন্ধুদের তো প্রশ্নই উঠেনা। আমার স্কুল বন্ধুদের অনেকেই আজ চট্টগ্রামে নেই। জীবনযুদ্ধে অংশ নিতে কেউ হয়তো বিদেশে, কেউবা রাজধানী ঢাকা বা অন্য কোনো শহরে। তবে আমাদের যোগাযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি ভালোবাসা একটুও কমেনি।
মাঝে মাঝে মন খারাপ করা বিকেলে ইচ্ছে হয় প্যারেড মাঠ সংলগ্ন হোস্টেলের দেয়াল বসে আগের মতো আড্ডা দেই বা সবুজ হোটেলে হালিম পরটা খেতে যেতে চায়ের কাপে ঝড় তুলি বা চকবাজার ওয়াসা কলোনীতে রানাদের ছোট লনে ব্যাট-বলের ক্রিকেট খেলার উল্লাসে মেতে উঠি। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজন আমরা অনেকেই হয়তো আজ বহুদূরে তবে এখনো সেই একই মানুষ, একই বন্ধু।
বন্ধু মানে একসাথে পথ চলা, বন্ধু মানে মনের কথা উজার করে বলা। বন্ধুরা কখনো শিক্ষক, কখনো বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছাস আর কখনো হই হল্লোড়। আত্মার আত্মীয় আমার বন্ধুরা কখনো কখনো রক্তের বন্ধনকেও ছাড়িয়ে গেছে। পৃথিবীতে বন্ধুত্ব বেঁচে থাকুক। অনেক ভালো থাকুক আমার বন্ধুরা।
